কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের 'নূরলদীনের সারাজীবন' : ২৫তম মঞ্চায়ন

কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের 'নূরলদীনের সারাজীবন' : ২৫তম মঞ্চায়ন

বর্তমান বাংলা থিয়েটারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রযোজনা কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের 'নূরলদীনের সারাজীবন' | ইতিমধ্যে নাটকটির ২৪টি সফল মঞ্চায়ন হয়ে গ্যাছে | আজ ১৩ জুলাই বৃহস্পতিবার অ্যাকাডমি অফ ফাইন আর্টসে নাটকটির ২৫তম মঞ্চায়ন | ওপার বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক রচিত এই নাটক প্রথমবার কোন ভারতীয় দল মঞ্চস্থ করছে | এবং এক বছর না ঘুরতেই তার ২৫তম মঞ্চায়ন আসন্ন | কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের এই নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয় ২৫আগস্ট ২০১৬ | এর মধ্যে বাংলাদেশেও নাটকটির ৪টি অভিনয় হয়েছে | ২৫তম অভিনয় ঘিরে রয়েছে পরিচালক কিশোর সেনগুপ্তের বিশেষ ভাবনা | এছাড়াও প্রচারের জন্য কল্যাণী নাট্যচর্চা ব্যবহার করেছে ফেসবুক লাইভের, যা বর্তমান বাংলা থিয়েটারের প্রচারের দিকে এক অভিনব পদক্ষেপ | দর্শকের মধ্যেও বিশেষ উন্মাদনা লক্ষনীয় | এর থেকে বোঝা যায় বাংলা থিয়েটারের সুদিন ফিরে এসেছে |

 


দিল্লীর বাদশাহ্ দ্বিতীয় শাহ্ আলম-এর কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অধিকার পেলেও নানাকারণে তা সংগ্রহে তেমন সাফল্য পায় না | ফলে ১৭৭০ নাগাদ কোম্পানি এক ভায়াবহ আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পরে | এ-সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ পেতে নির্দিষ্ঠ পরিমান রাজস্ব আদায়ের জন্য কোম্পানি শুরু করে অমানবিক শোষণ | ফলস্বরূপ ঐ বছরই (বাংলা ১১৭৬ সাল) ঘটে যায় বাংলার প্রথম মন্বন্তর | তুমুল সমালোচিত হয় ইংল্যান্ডের হাউস্ অফ্ লর্ড্স্-এ কোম্পানির ভুমিকা এবং কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্রিটিশ রাজের হস্তক্ষেপে লাগু হয় এক নিয়ন্ত্রণমূলক আইন | লর্ড্ ওয়ারেন হেস্টিংস্ ১৭৭২-৭৩ থেকে কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের স্বত্ব চুক্তিতে বিক্রি করতে শুরু করেন পূর্বে নবাবী আমলে রাজস্ব আদায়ে নিযুক্ত কিছু ব্যক্তির কাছে | রাজপূত বংশজাত রাজা দেবীপ্রসাদ সিং এভাবেই ১৭৮১-৮৩ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার রঙ্গপুরে রাজস্ব আদায়ের স্বত্ব পান | ডিমলার জমিদার গৌরমোহন চৌধুরীকে দোসর করে রাজস্ব আদায়ের নামে দেবী সিং কৃষকদের ওপর শুরু করেন ভয়ঙ্কর অত্যাচার | দরিদ্র প্রজাগণ গরু বাছুর সম্পত্তি এমনকি স্ত্রী পুত্র বিক্রি করেও দেবী সিং-এর নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায় না | অবশেষে বিদ্রোহ | জাতপাত নির্বিশেষে রঙ্গপুরের কাজিরহাট, কাকিনা, ফতেপুর, ডিমলা প্রভৃতি স্থানের গরীব মানুষেরা নূরলদীনের নেতৃত্বে ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি টেপায় মিলিত হয়ে দেবী সিং-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং নূরলদীনকে নবাব ও দয়ারাম শীলকে দেওয়ান নির্বাচিত করে রঙ্গপুরে গঠন করেন এক পাল্টা প্রশাসন | এ-বিদ্রোহ টিঁকেছিল মাত্র পাঁচ সপ্তাহ | মোগল হাt ও পাটগ্রামের অসম লড়াই-এ লেফটেন্যান্ট ম্যাক্ডোনান্ডের নেতৃত্বাধীন কোম্পানি বাহিনীর হাতে ২১ ফেব্রুয়ারি নিহত হন নূরলদীন; অবসান হয় বিদ্রোহের |
 
 
ইতিহাসের এই অধ্যায় অবলম্বনে কিংবদন্তীসম সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক রচনা করেন এই কাব্যনাট্য - নূরলদীনের সারাজীবন; মাটির গন্ধ গায়ে মেখে ধবল জোছনায় বেড়ে ওঠা এক সাধারণ কৃষকের আশ্চর্য জীবন-আখ্যান | এ-আখ্যানে ইতিহাসের নূরলদীন, দয়াশীল, গুড্ল্যাড, ম্যাক্ডোনাল্ডদের পাশাপাশি আছে কল্পনার আব্বাস, আম্বিয়া, লিসবেথ | নূরলদীনের আত্মা ও প্রেরণা ইতিহাস আশ্রিত নিশ্চয়ই; কিন্তু ব্যক্তিজীবন ও মানসিক সঙ্কট নাট্যকারের আবিষ্কার | এ-আখ্যানের হাত ধরেই ইতিহাস এসে দাঁড়ায় মানুষের বন্ধ দরজায় তার নিবিড় উচ্চারণ নিয়ে -
ধৈর্য সবে, ধৈর্য ধরি করো আন্দোলন
লাগে না লাগুক, বাহে, এক দুই তিন কিংবা কয়েকজীবন |
 
 
 
 
নিরাভরণ মঞ্চে অভিনীত হয় নাটকটি | মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন হিরণ মিত্র, আলো করেছেন দীপক মুখোপাধ্যায় | একটিমাত্র চাঁদ মঞ্চের বুকে ভেসে থাকে আর তার নিচেই রচিত হয় একের পর এক দৃশ্যপট | ইংরেজ অত্যাচারিত গ্রাম বাংলার মানুষের দুর্দশার প্রতিবাদের আগুন ঝরে পরে নূরলদীনের কন্ঠে | সেই প্রতিবাদ রূপ নেয় বিশাল আন্দোলনের | নূরলদীনের নেতৃত্বে গঠিত হয় সতন্ত্র সরকার | নিজের অজান্তেই নূরলদীনের হাতে রচিত হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পদক্ষেপ | দেশের নানা প্রান্তের মানুষ দলে দলে যোগদান করেন নূরলদীনের সঙ্গে | মঞ্চে একের পর এক সেই চিত্র তৈরী করে কোরাস টিম | প্রতিমুহুর্তে কোরাস টিমের শারীরিক অভিনয় মুগ্ধ হতে হয় দর্শককে | এবং সেই শারীরিক অভিনয় মূল বক্তব্যের অন্তরায় না হয়ে তৈরি করে নতুন আবহের | যা নাটকটিকে নান্দনিক করে তুলতে থাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত | এর পিছনে কতটা অনুশীলন ও পরিশ্রম আছে তা সত্যিই বোঝা যায় | একসঙ্গে ২৪ জন মঞ্চে এত সুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে ও পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিনয় করেন যা কখনোই ভির বলে মনে হয় না | এখানেই পরিচালক কিশোর সেনগুপ্তের মঞ্চ ব্যবহারের শিল্প ভাবনায় দক্ষতা ও রুচিশীলতা প্রকাশ পায় | 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
নাটকটির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন দীপঙ্কর দাস | এর আগেও বিভিন্ন নাটক যেমন খোয়াবনামা, হারিয়ে যায় মানুষ, দস্যু কেনারাম, নকশীকাঁথার মাঠ ইত্যাদিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে | আর এই নাটকে তাঁর অভিনয় কুশলতা নাটকটির মান অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয় |  বিরতির পর প্রায় ২৫মিনিটের একটি একক অভিনয়ে নূরলদীন তার বাবার মৃত্যুর বর্ণনায় দর্শককে সম্মোহিত করে ফেলে | মঞ্চে সৃষ্ট আবেগতাড়িত মুহূর্ত সঞ্চারিত হয় দর্শকমনেও | আর এখানেই অভিনেতার অভিনয় কুশলতা ও সফলতা প্রমানিত হয় |
 
 
 
এছাড়াও এই নাটকে যারা অভিনয় করেন তারা প্রত্যেকেই নিজের অভিনয় অসামান্য কুশলতায় উপস্থাপনা করেন তাদের মধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য নূরলদীনের বন্ধু আব্বাসের ভূমিকায় অনিরুদ্ধ বিশ্বাস | নূরলদীনের স্ত্রী আম্বিয়ার অভিনয় মধুলেখা দত্ত, দয়াশীলের চরিত্রে স্বপন পাল | এছাড়াও ইংরেজ চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করেন তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের চরিত্রের ভূমিকায় অসাধারণ যেমন গুড্ল্যাড অনুপম চক্রবর্তী, ম্যাকডোনাল্ড কিশোর সেনগুপ্ত, টমসন উত্তম ঘোষ, মরিস অতনু সরকার, লিসবেথ শৈলী দত্ত | পাশাপাশি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য যাঁরা কোরাস টিমে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা হলেন পপি রায়, অর্পিতা মন্ডল, শর্মিষ্ঠা দে, রাখি সেন, অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপঙ্কর তলাপাত্র, নিলয় নাথ, দীপ্তেশ্বর মণ্ডল, সৌমি আচার্য্য, পায়েল চক্রবর্তী, অভিজিৎ মণ্ডল, শৌমিক দে, রনিক মুন্সী, মহেশ কৈরী এবং সৌমি ভট্টাচার্য | অন্যদিকে নাটকটিতে সঙ্গীতের ব্যবহারও প্রতিমুহুর্তে অনুরিত করেছে দর্শক মনকে, যেমন নূরলদীনের প্রতিবাদী কন্ঠের সাথে কিম্বা আম্বিয়ার স্বামী দীর্ঘদিন ঘরে না ফেরার কষ্টে | আবহ নির্মানের কাজটি গুণগত মান বজায় রেখে করেছেন ময়ুখ মৈনাক |
সব মিলয়ে নাটকটি যে বাংলা থিয়েটারের অনন্য মাত্রা যুক্ত করেছে তা আর বলার আবকাশ রাখে না |
 

place name place name place name