শিলচর বাংলা ভাষা আন্দোলনের ৫৫বছর

শিলচর বাংলা ভাষা আন্দোলনের ৫৫বছর

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে সারা পৃথিবী জুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস | বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে মৃত্যুকে বরণ করে শহীদ হয়েছিলেন অনেকে | বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার দাবিতে এক বার নয়, একাধিকবার মৃত্যুকে বরণ করেছে আন্দোলনকারীরা | 


আসামের বরাক উপত্যকার শিলচরে বাংলা ভাষার দাবিতে ১৯৬১ সালের ১৯ মে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ১১ জন শহীদ | 
 
১৯৬০ সালের এপ্রিলে, আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে অসমীয়া ভাষাকে প্রদেশের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় | আসাম বিধানসভায় সরকারি ভাষা বিল গৃহীত হয়ে কাছাড় জেলায় কংগ্রেস-বিরোধী মনোভাব বহ্নিমান হয়ে ওঠে | কাছাড়ের কংগ্রেসী নেতারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছেন বলে সাধারণ মানুষের ধারণা হয় | আসাম সরকার কাছাড়ের বাঙালি, মণিপুরি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মানুষের ওপর জোর করে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দিচ্ছেন, এটা জানতে পেরে সবাই প্রতিবাদে কঠিন হয়ে ওঠেন | শুরু হয় সমগ্র কাছাড় জেলায় গণআন্দোলন | আন্দোলনে যোগ দেন যুবসমাজ, ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ | অন্যদিকে আসামের সর্বত্র সংখ্যালঘু বাঙালি নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে সংবদ্ধ হয় | ১৯৬০ সালের নভেম্বর মাসে আসামের হোজেই শহরে 'নিখিল আসাম বঙ্গ ভাষাভাষী সমিতি'র এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় | এই সম্মেলন থেকে এই অত্যাচারের তীব্র সমলোচনা ওঠে |
সরকারি ভাষা বিলের বিরোধিতায় ১৯৬১ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জ শহরে অনুষ্ঠিত হয় 'কাছাড় জেলা জনসম্মেলন' | সমগ্র কাছাড় জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় চারশ প্রতিনিধি এতে যোগ দান করেন | এই আন্দোলন থেকে বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষা রূপে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ওঠে | এই দাবিতে ১৩৬৮এর ১ লা বৈশাখ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় | 
১লা বৈশাখ, ১৩৬৮(১৪ই এপ্রিল ১৯৬১) দিনটি কাছাড় জেলার সর্বত্র সংকল্প দিবস হিসাবে পালিত হয় | ১৫ই এপ্রিল থেকে ১৫ই মে পর্যন্ত পথসভা সভা, শোভাযাত্রা, পদযাত্রা ইত্যাদির মাধ্যমে জনসাধারনকে সচেতন ও আন্দোলনমুখী করে তোলার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় | ১৯ শে এপ্রিল থেকে ২রা মে পর্যন্ত প্রায় দুই সপ্তাহকাল ধরে একদল সত্যাগ্রহী পদযাত্রী করিমগঞ্জ শহর থেকে যাত্রা শুরু করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাংলাভাষী জনসাধারনকে আন্দোলনের তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন | করিমগঞ্জের পদযাত্রার দৃষ্টান্তে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিলচর ও হাইলাকান্দি শহর থেকে যথাক্রমে ২৪শে এপ্রিল এবং ১০ই মে অনুরূপ পদযাত্রার আয়োজন করা হয় |
১৯শে মে সমগ্র জেলায় সর্বাত্মক ধর্মঘট ও পূর্ণ হরতাল পালনের আহ্বান করা হয় | সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে স্তব্ধ করতে ও পথ অবরোধ, রেল অবরোধের মাধ্যমে প্রতিবাদের পথ বেছে নেন অসংখ্য মানুষ | শান্তিপূর্ণ অসহযোগ ও সত্যাগ্রহ আন্দোলন বিশাল আকার ধারণ করে | শিলচর রেল স্টেশনে নিরস্ত সত্যাগ্রহী মানুষের ওপর বিনা প্ররোচনায় পুলিশ গুলি চালায় বেলা ২.৩০ নাগাদ | ভাষার প্রতিষ্ঠার দাবিতে মৃত্যু বারণ করেন যে ১১ জন সেই শহীদরা হলেন কানাইলাল নিয়োগী, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য |
 
এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক তরজা চলার পর অবশেষে ১৯৬৫ সালে কাছাড় জেলায় বাংলা ভাষার অধিকার স্বীকৃত হয় সরকারি ভাবে | তাছাড়া গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পাঠক্রম চালু হয় | 

place name place name place name